৬ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার

ইভিএমে বড় সমস্যা আঙ্গুলের ছাপ!

আপডেট: জানুয়ারি ১৬, ২০২১

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও ছেলের সাথে ভোট দিতে এসেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব ফিরুজা বেগম। কিন্তু ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) আঙ্গুলের ছাপ না মেলায় পরপর দুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। তাই ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। বেশকিছু কেন্দ্রে ভোটারদের আঙ্গুলের ছাপ (ফিঙ্গার প্রিন্ট) না মেলায় তারা ভোট দিতে পারেননি।

তবে, আঙ্গুলের ছাপ না মেলা নিয়ে বড় অভিযোগ আসলেও ভোটারদের বেশিরভাগই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট পদ্ধতি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ইভিএমে ভোট দেয়া সহজ এবং কোনো ঝামেলা নেই।

শুধু ফিরুজা নন, শ্রীপুর পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে এসে এমন বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ছেন অনেকে। ইভিএমে আঙ্গুলের ছাপ না মেলায় ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন তারাও। তবে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা আঙ্গুলের ছাপ না মেলা ভোটারদের বাড়ি থেকে সাবান-পানি দিয়ে ভালো করে আঙ্গুল পরিষ্কার করে আবার ভোট দিতে আসার পরামর্শ দেন।

ভোট দিতে না পেরে ৩নং ওয়ার্ডের লোহাগাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (মহিলা) কেন্দ্রের নতুন ভোটার খাদিজা (১৮ বছর ৯মাস) আক্ষেপের সুরে বলেন, দুইবার ভোট দিতে গেলাম। কিন্তু মেশিনে আঙ্গুলের ছাপ উঠে না। ভোটকেন্দ্র থেকে বলছে তালিকায় নাম না থাকা এবং আঙ্গুলের ছাপ মিলে না। তাই, বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।

ওই ভোটকেন্দ্রে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রার্থীর এজেন্ট জানান, যাদের বয়স পঞ্চাশের বেশি তাদের আঙ্গুলের ছাপ মেলাতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। অনেকে আঙ্গুলের ছাপ না মেলায় ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরে গেছেন।

এদিকে, সকাল থেকে একটু ঠান্ডা থাকলেও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। ভোট চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।

পঞ্চাশোর্ধ্ব এমদাদুল হক মন্ডল। শ্রীপুর পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে ৩নং ওয়ার্ডের লোহাগাছ ফোরকানীয়া মাদ্রাসায় (পুরুষ) ভোট কেন্দ্রে যান। ভোটার তালিকার সঙ্গে জাতীয় পরিচয় পত্রের নাম ও ছবির মিল থাকলেও আঙ্গুলের ছাপ মেলেনি। তাই কষ্ট নিয়ে ভোট কেন্দ্রের বাহিরে অপেক্ষা করছেন।

একই কেন্দ্রের লোহাগাছ (মধ্যপাড়া) এলাকার ভোটার মকবুল হোসেন (৫৫) বলেন, ভোট দেয়ার গোপন কক্ষে গিয়ে এই ভোটার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার উদ্দেশে বলেন, স্যার, কোন আঙ্গুল দিয়ে ভোট দিমু। মাঝের আঙুল দিয়ে বোতাম চাপলে কি ভোট হবে। নাকি বুড়ো আঙুলে চাপতে হবে। এসময় ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা তাকে বলেন যে কোনো আঙ্গুল দিয়ে আপনি বোতাম চেপে ভোট দিতে পারবেন।

প্রথমবারের মতো শ্রীপুর পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএমে এ ধরনের নানা বিড়ম্বনায় পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে সব থেকে বড় অভিযোগ আঙ্গুলের ছাপ না মিলা। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিড়ম্বনায় পড়ার অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়া লোহাগাছ (মধ্যপাড়া) গ্রামের বাসিন্দা নারী ভোটার ফরিদা বেগম (৩২) বলেন, ভোটের পরিবেশ বেশ ভালো। কিন্তু আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে আমাকে একটু বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। জাতীয় পরিচয় পত্রের নাম ও ছবির সঙ্গে মিল থাকলেও আঙ্গুলের ছাপ মেলেনি। তাই ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও তিনি ভোট দিতে পারেননি।

লোহাগাছ ফোরকানীয়া মাদ্রাসায় (পুরুষ) কেন্দ্রে ভোট না দিতে পেরে ফিরে যাচ্ছিলেন আবুল কালাম মোল্লা (৬০)। তিনি বলেন, মেশিনে আমার আঙ্গুলের ছাপ নিচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করেও ভোট দিতে পারেনি। অফিসাররা বলেছে, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে আসতে। হাত ধুয়ে আবার আসব।

ভোটারদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লোহাগাছ ফোরকানীয়া মাদ্রাসায় (পুরুষ) ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মাসুদ-আল ফারুক বলেন, এ কেন্দ্রে সাতটি বুথে ২ হাজার ৪৮৮টি পুরুষ ভোট রয়েছে। সকাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ জনের হাতের ছাপ মেশিনে মেলেনি। বয়স্কদের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে।

৭নং ওয়ার্ডের ২নং সিএন্ডবি এলাকার বাসিন্দা নারী ভোটার রাজিয়া বেগম বলেন আগে কখনও ইভিএমে ভোট দেয়নি। তবে ইভিএমে ভোট দেয়া খুব সহজ। আমার কাছে আগের পদ্ধতি থেকে এটাই ভালো মনে হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে ভোটে চুরি-চামারি করার সুযোগ নেই।

মাওনা চৌরাস্তা এলাকার ভোটার মানিকজান বিবি (৯০) বলেন, আগেরবার সিল মেরে ভোট দিতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছিল। এবার ভালো ভাবেই ভোট দিতে পারছি। আমার কাছে আগের থেকে এবারের ভোটের পদ্ধতি ভালো মনে হচ্ছে।

৯নং ওয়ার্ডের কমিশনার প্রার্থী আমজাদ হোসেন বলেন, নতুন পদ্ধতিতে প্রথমে একটু সমস্যা হবেই। প্রথম প্রথম যোগ-বিয়োগ করতে গেলেও ভুল হয়। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। তবে আমার কাছে ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি খুব ভালো মনে হচ্ছে।

৯নং ওয়ার্ডের (কড়ইতলা) এলাকার বাসিন্দা ভোটার শহিদুল ইসলাম বলেন, ইভিএম পদ্ধতিতে খুব সহজে ভোট দিতে পারছি। নির্ভয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছি। মেশিনের মাধ্যমে ভোট চুরির কোনো সুযোগ নাই। এটা ভালোই লাগছে।

জীবনের প্রথম ভোট ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে প্রদান করে কেওয়া পশ্চিম খণ্ড (কড়ইতলা) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আয়েশা মনি বলেন, খুব সহজেই ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে ভোট দিতে পেরেছে। এটি অনেক সহজ ও সময় কম লাগে। আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে সব তথ্য পাওয়া গেছে। গোপন কেন্দ্রে গিয়ে ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে নিজের ভোট প্রদান করেছেন।

শ্রীপুর পৌর নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এ এম শামসুজ্জামান বলেন, বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ফিঙ্গার প্রিন্ট (আঙ্গুলের ছাপ) না মেলায় কিছু সংখ্যক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। আমাদের মোবাইল টিম নির্বাচনী মাঠে রয়েছে। ৩টার পর তাদের আসতে বলা হয়েছে। সবার ভোট নেওয়া হবে। কেউ ভোট না দিয়ে যাবেন না।

ইভিএমে ভোট দিতে গিয়ে অনেকের আঙ্গুলের ছাপ না মেলার খবর পেয়েছেন বলে জানান শ্রীপুর পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইস্তাফিজুল হক আকন্দ। তিনি জানান, আমি ঢাকা কন্ট্রোল রুমে কথা বলেছি। দুপুরের পর সার্ভার ঠিক হয়ে যাবে। যারা ভোট দিতে আসছে তারা কেই ভোট না দেিয় যাবে না। সবাইকে ভোট দিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

ভেতরে দ্রুত হয়, লাইন এগোয় না

পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের ভাংনাহাটি পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেছে। এখানে নারী ভোটারদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ভোট দেওয়ার পর অনেকেই বলেছেন, ভেতরে খুব অল্প সময়ে ভোট হয়, কিন্তু লাইন এগোয় না কেন? ওই কেন্দ্রে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেন নামজমা আক্তার।

তিনি বলেন, আমার ভোট দিতে সময় লাগল ২০ থেকে ২৫ সেকেন্ড। আরও অনেকেরই একই রকম সময় লেগেছে। কিন্তু লাইনে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।

কাউন্সিলর প্রার্থী কামরুজ্জামান মন্ডল বলেন, অনেক নারী ভোটার রয়েছেন, তারা ভেতরে ঢুকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারেন না। আর ইভিএমে এখানে ভোট হচ্ছে প্রথম। তাই একটু দেরি হচ্ছে। আবার অনেক অসুস্থ ও বৃদ্ধদের আগে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল শেখ বলেন, যাদের সমস্যা হচ্ছে তাদের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা সাথে কথা হয়েছে। যেসব ভোটার বিকাল ৪টার মধ্যে ভোট কেন্দ্রের মধ্যে প্রবেশ করবে আমরা তাদের ভোট অবশ্যই নিব।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
আমাদের চ্যানেল ৩৬৫ ফেসবুক লাইক পেজ