২৫শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

স্বপ্ন দেখায় স্বপ্ন পূরণ বিদ্যানিকেতন

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

সাইমুন রহমান এলিট, গলাচিপা:
সবার জন্য শিক্ষা- এ শ্লোগানকে ধারণ করে একজন শিক্ষক ও কলেজ পড়ুয়া পাঁচ শিক্ষার্থী মিলে উপকূলীয় গলাচিপার ‘মান্তা সম্প্রদায়’ ও দিনমজুর পরিবারের ২৮ শিশুকে স্কুলমুখী করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। পালা করে সপ্তাহে ছয় দিন নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন গলাচিপা সরকারি ডিগ্রি কলেজের ছাত্র তৌকিক রাইয়ান সাকিব, জিতু আহমেদ, তানভির হোসাইন রিফাত ও অমিত হাসান অকিব। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট না করে কোমলমতি শিশুদের স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখান তারা। এখন ‘মান্তা’ সম্প্রদায় ও দিনমজুর পরিবারের স্কুল বিমুখ শিশুরা বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখবে বলে বিশ্বাস করেন এই পাঁচ তরুণ। বিদ্যালয়ের আদলে না হলেও গলাচিপা পৌর এলাকার এক নম্বর ওয়ার্ডের পুরান লঞ্চঘাট এলাকায় বটতলায় মাদুর বিছিয়ে সপ্তাহে ছয় দিন চলে এ স্কুলটির কার্যাক্রম। তাদের এ উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।

‘মান্তা’ সম্প্রদায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
উপকূলীয় গলাচিপা পৌর এলাকার রামনাবাদ নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এ সম্প্রদায়ের আবাস। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন জায়গায় এ সম্প্রদায়টি বসবাস করে আসছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ‘মানতা’ সম্প্রদায়ের কোন তালিকা প্রস্তুত হয়নি কিংবা এদের জীবন সংগ্রাম বা এদের আদি ইতিহাস সৃষ্টির কাহিনী লিপিবদ্ধ হয়নি। যে কারণে এরা আজও সমাজের সকল স্তরের কাছ থেকে অনেক দূরে রয়েছে। আর তাদের জীবন রহস্য নিয়েও রয়েছে নানা কাহিনী। যে যে ভাবে পারছে এলাকাবাসী কিংবা সংবাদকর্মীদের কাছে তাদের মনগড়া কথা বলে যাচ্ছেন। তবে একটা কথা দীর্ঘদিন ধরে সত্য হিসাবে উপকূলীয় এলাকাবাসীদের মনে জাগ্রত করেছে তা হলো, ‘মানতারা সাধারণত কোন না কোন সময়ের নদী ভাঙ্গনের শিকার কম আর বেশি’। আর এ সম্প্রদায়ের লোকজন সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো ভূখ-ে বসবাস করে না বলেই এদের শিশুরা সুনির্দিষ্ট কোন স্কুলে পড়াশুনার সুযোগ করে নিতে পারে না। নৌকাতেই এদের বসবাস, নৌকাতেই এদের জীবন। জীবন সংগ্রামে লড়তে গিয়ে দুমুঠো ভাতের জন্য পড়া শোনার চেয়ে এরা গুরুত্ব দিয়ে থাকে মাছ শিকারকে। এ সম্প্রদায়ের শিশুরা কোন বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও দু’এক মাস পরে নৌকায় মাছ শিকার করতে চলে যায় এক নদী থেকে আরেক নদীতে, এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলায়। তাই এসকল শিশুরা পড়াশোনা শুরু করলেও তার আর শেষ করতে পারে না।

বিদ্যালয়টি যেমন
ভিন্ন ভিন্ন স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণির ঝরে পড়া এসব শিশু এখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। প্রদিন বিকেল তিনটা থেকে চারটা পর্যন্ত চলে বিদ্যালয়টির শ্রেণি কার্যক্রম। তিন চারটি মাদুর পেতে গলাচিপা পৌর এলাকার এক নম্বর ওয়ার্ডের পুরান লঞ্চঘাট এলাকায় বটতলায় বসে যায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কখনো সরব পাঠ আবার কখনো লেখালেখি। আবার কখনো আবৃত্তি, গানে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকাটি। রাস্তার পাশে হওয়ায় কৌতুহল নিয়ে বিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীর শ্রেণি পাঠ দেখছেন অভিভাবক ও পথচারীরা। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন পড়াশোনা করে শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র, পুলিশ অফিসার আবার কেউ ড্রাইভার, ব্যবসায়ীও হতে চায়। পড়ার ফাঁকে চলে খেলাধুলা, গান, আবৃত্তি ও অভিনয়। আর এসবের পরে ছটির সময় বিস্কুট বা চকলেট পেয়ে উল্লাস করে বাড়ি ফিরে যায় সকল শিক্ষার্থী।

স্বপ্ন পুরণ বিদ্যানিকেতনের শিশুদের কথা
ঘরে মায়ের সাথে গৃহস্থলি কাজ করায় বিদ্যালয় যেতে পারেনা খাদিজা। খাদিজাতের মতো অনেক শিশুই আছে যাদের ইচ্ছে থাকলেও বিদ্যালয় যেতে পারছে না। গলাচিপা পৌর এলাকার পুরান লঞ্চঘাট এলাকার স্বপ্ন পুরণ বিদ্যানিকেতনের শিক্ষার্থী (২য় শ্রেণি) খাদিজা বলেন, ‘আমি অনেক দিন ধইরা ইশকুলে যাই না। আমার মায়ের সাথে কাম (কাজ) করি। বিকেলে স্বপ্নপুরণ স্কুলে যাই। আমি পড়া শোন কইরা (করে) ভবিষ্যতে শিক্ষক হবো।’

দীর্ঘদিন ধরে পড়া শোনা বাদ দিলেও জানার আগ্রহ তার কমেনি রাশেদের। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়া শোনা পাশে দাঁড়িয়ে আগ্রহ নিয়ে দেখছিলেন নাসির সর্দারের ছেলে রাশেদ (১৩)। রাশেদ বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধইরা আমি পড়া লেহা বাদ দিছি। একবার সরকারি ইশকুলে গেছিলাম, হেই সময় মারামারি করছি, ইশকুলের আপারা গালাগালি করছে, হেলিগ্যা মায় আমারে আর ইশকুলে যাইতে দেয় নাই।’ রাশেদ আরো বলেন, ‘মোন চাইলেও এহন আর পড়া লেহা করতে পারমু না। আগে প্যাডের ভাত জোগার করতে অইবো, পরে লেহা পড়া।’ এখন ভবিষ্যতে কি হতে ইচ্ছে করে? এমন প্রশ্নের জবাবে রাসেদ বলেন, ‘নৌকা বাইতে কষ্ট লাগে, ঝড়, বিষ্টি, রউদে পুইড়া নদীতে থাকতে অয় (হয়)। এহন আছি ঠেইক্কা। ভবিষ্যতে সুযোগ পাইলে গাড়ির ড্রাইভার অমু (হবো)।’
স্বপ্ন পুরণ বিদ্যা নিকেতনের ক্লাশ করার পর আগ্রহ বেড়েছে শারিরীকি প্রতিবন্ধী জান্নাতির। তার মায়েরও ইচ্ছে জান্নাতি আবার ভালোভাবে পড়াশোনা করুক। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতি বলেন, ‘ইশকুলে ভর্তি অইছি। যাইতে পারি না। মায়ের সাথে ঘরের কাম করতে অয়। থালাবাসন ধোয়া, বিছানা গুছানো, ঘর কুড়ানোর কাম করতে অয়। এই কাম কইরা আর সময় পাই না। কয়েক মাস ধইরা এইহানে পড়ি। মায় কইছে এহন অইতে আমি ইশকুলে যামু।’

আবার মাছ ব্যবসায়ী মো. সামসুলের শিশুপুত্র নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমার বন্ধু জিসান, হেনাকে ইশকুলে যাইতে দেইখ্যা আমারো ইশকুলে যাইতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কি করমু? যাইতে পারি না। আমারে পৌরসভার পূব বাজারের একটা মুদি দোকানে কামে রাখছে। বেইন্নাকালে দোকানে যাই, রাইত দশটার দিকে বাসায় আই। বেইন্না কালে আমার দোকানের সামনে দিয়া অনেক পোলাপানে ইশকুলে যায়। আমি যাইতে পারি না। আমি একলা একলা অনেক কানছি। কয়েকদিন আগে মায়রে কইছি আমি লেহাপড়া করমু। এহন এই ইশকুলে পড়মু, কয়েকদিন পর আমারে সরকারি ইশকুলে পাডাইবে।’

অভিভাবকদের কথা
স্বপ্ন পুরণ বিদ্যা নিকেতনের অভিভাক মোস্তফা হাওলাদার মনে কলেন- ‘ছেলে মেয়রা ছোট থেকেই বাবা মায়ের সাথে নৌকায় মাছ ধরলে সংসারের আয় বাড়ে, নিজেরাও সাবলম্বী হয়। একই সঙ্গে মাছ ধরার কৌশলও শেখা হয়ে যায়। তাই তাদের সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে নৌকায় মাছ ধরার কৌশল শেখাচ্ছেন। এতে নিজের ও সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসে।
বিদ্যালয়টির পাশেই চায়ের দোকান দিচ্ছেন জান্নাতির মা সুুখি বেগম। জান্নাতি সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও হঠাৎ করেই পড়া শোনা বাদ দিয়ে দেয়। পরে আবার স্বপ্ন পুরণ বিদ্যানিকেতনে গিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করেছে। জান্নাতির মা সুখি বেগম বলেন, ‘কি করমু কন? আমার স্বামী গত এক বছরেরও বেশি সময় ধইরা আমাগো কোনো খবর নেয় না। হুনছি হে নাকি আরেকটা বিয়া করছে। প্রথমে সরকারি ইশকুলে ভর্তি করছিলাম। সমস্যার কারণে যাইতে পারে নাই। এহন এইহানে বিয়ালে ইশকুলে যায়।’
কাঁচামাল ব্যবসায়ী মমতাজ বেগম বলেন, ‘আগে আমরা লেহা পড়ার মর্ম বুঝি নাই। এহন লেহাপড়া না অইলে কিছুই করা যায় না। এই ইশকুলে যাওয়ার পর দেহি আমাগো গুরাগারা ভালই পড়ালেহা করছে। নিজেগো নাম দস্তখত করতে পারে।’

সহযোগীরা যা বলেন
বিদ্যালয়টির শুরুতে না থাকলেও কার্যক্রম দেখে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এলাকার আরেক তরুণ মো. জাহিদুল ইসলাম নোমান। একান্ত আলাপচারিতায় নোমান জানান, বিদ্যালয়টির উদ্যোক্তা সাকিবের ফোন পেয়ে আমি শিশুদের দেখতে যাই। ওখানে গিয়ে আমি ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদের সাথে কথা বলি। ওই দিন বাচ্চাদের মিষ্টি, চকলেট, খাতা-কলম কিনে দেই। পরে চিন্তা করে দেখলাম পাঁচ তরুণ যদি বিনা পারিশ্রমিকে এতো বড় দায়িত্ব নিতে পারে তাহলে আমরা কেন পাশে দাঁড়াতে পারবো না? এ ভাবনা থেকেই তিনি এ বিদ্যালয়ের শিশুদের শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন সহযোগিতা করে আসছেন। নোমান বলেন, ‘আমি এক সাথে নয়, প্রতিটি ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করছি যাতে শিশুরা পুরষ্কৃত হয়ে আনন্দে স্কুলমুখী হয়।’
এছাড়াও স্বপ্নপুরণ বিদ্যা নিকেতনের শিশুদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্েরর চিকিৎক মো. মস্তফা সিকদার। তিনি এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের ফ্রি চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। এছাড়া মাসে একবার বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সেবা দেন।

বিদ্যালয়ের কার্যক্রম দেখতে যারা এসেছিলেন
এ বিদ্যালয়টি কার্যক্রম দেখতে ঘুরে গেছেন গলাচিপা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফোরকান কবির, গলাচিপা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হালিম, সিনিয়র সাংবাদিক শংকর লাল দাশ, সমাজকর্মী সর্দার মু. শাহ আলমসহ বিভিন্ন গুণী লোকজন।
গলাচিপা ডিগ্রি কলেজর অধ্যক্ষ মো. ফোরকান কবির বলেন, ‘স্কুলটি আমি পরিদর্শন করেছি। ছাত্ররা যে উদ্যোগটি নিয়েছে আমি সাধুবাদ জানাই। আমরা সবাই এগিয়ে আসলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ এলাকায় ঝরে পড়া শিশু সংখ্যা কমে আসবে।’

উদ্যোক্তা যা বলেন
স্বপ্ন পুরণ বিদ্যানিকেতনের প্রধান উদ্যোক্তা রুবায়েত হাসান রাসেল আমি ব্যক্তি জীবনে একজন শিক্ষক। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছরই কোন না কোন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘মান্তা’ সম্প্রদায় এবং দিনমজুর পরিবারের শিশুরাই বেশি। বিষয়টি নজরে আসার পর আমার প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে এ বিষয়টি আলাপ করি। ওরাও রাজি হয়ে যায়। তখন থেকেই শুরু করি স্বপ্ন পুরন বিদ্যানিকেতনের কাজ। এ প্রসঙ্গে আরেকজন উদ্যোক্তা সাকিব হাসান বলেন, ‘মান্তা সম্প্রদায়ের’ শিশুদের নৌকাই দেখতাম। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি এরা ভর্তি হলেও এখন আর স্কুলে যায় না। বাবা মায়ের সাথে নৌকায় মাছ ধরে উপার্জন করছে। এদের স্কুলমুখী করতে আমাদের এ উদ্যোগ। এছাড়া দিন মজুর পরিবারের শিশুদের বিভিন্ন দোকান বা বাবা মায়ের সাথে কাজ করতে হয়। আমরা চেষ্টা করছি ঝড়ে পড়া এসব শিশুদের স্কুলমুখী করার।’

শিক্ষকরা যা বলেন
স্বপ্ন পুরণ বিদ্যা নিকেতনের মূল কারিগর তৌকিক রাইয়ান সাকিব ও অমিত হাসান। প্রতিদিন নিজের পড়া শোনা ছাড়াও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতেন। কোন এক বিকেলে ঘুরতে যাই। তখন শিক্ষক রুবায়েত হাসান রাসেল স্যার এসব ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ করেন। তখন তিনি আমাদের উদ্বুদ্ধ করেন এসব শিশুদের পড়া শোনায় আবার ফিরিয়ে আনা যায়। কয়েক দিন পর রাসেল স্যারের নেতৃত্বে আমারা গড়ে তুলি স্বপ্ন পুরণ বিদ্যানিকেতন। নতুন করে ঝরে পড়া শিশুদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করি।
এ প্রসঙ্গে ওই বিদ্যানিকেতনের শিক্ষক তৌকিক রাইয়ান সাকিব বলেন, ‘আমরা তখনই নিজেদেরকে শিক্ষিত জাতি বলবো যখন আমাদের চার পাশের সবাই শিক্ষিত হব। ঝরে পড়া কোমলমতি শিশুদের আমরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন দেখাই। এতেই আমরা তৃপ্তি পাচ্ছি এ জন্য যে, আমরা অন্তত কিছু শিশুদের আলোর পথ দেখাতে পারছি।’

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
আমাদের চ্যানেল ৩৬৫ ফেসবুক লাইক পেজ