১৮ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে রোহিঙ্গাদের ২ প্রস্তাব চীনা প্রতিনিধি দলের

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গাদের দুটি প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাম্প পরিদর্শনে আসা চীনা প্রতিনিধি দল।

রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দল গঠন করে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি দেখতে পাঠানোর কথা বলেন চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। সেখানে পরিস্থিতি দেখতে যাওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য দুটি প্রস্তাব দেন তিনি। একটি হলো- রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের সবাইকে জনপ্রতি দুটি করে মোবাইল সেট দেয়া হবে। একটি নিজে সে দেশে যাওয়ার সময় নিয়ে যাবেন, অন্যটি এখানে পরিবারের কাছে রাখবেন। যদি মিয়ানমারে পরিস্থিতি ভালো হয়, মোবাইলে পরিবারকে সে দেশে ডেকে নিয়ে যাবেন।

আরেকটি হলো- প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে গিয়ে অবস্থা দেখে ঘুরে চলে আসবেন। যদি সেখানের অবস্থা ভালো দেখে আসেন তাহলে পরিবার নিয়ে মিয়ানমারে ফেরত যাবেন।

সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজারের টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সিআইসি কার্যালয়ে ২০ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রস্তাব উত্তাপন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। এ সময় বাংলাদেশ শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন সহকারী কমিশনারসহ চীনের প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, মিয়ানমারে নাগরিকত্ব, কেড়ে নেয়া জমিজমা ফেরত দেয়া হলে এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে স্বেচ্ছায় সেখানে ফিরে যাবেন তারা। চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিংয়ের কাছে এসব বিষয় নিশ্চিতে সহায়তার দাবি জানান রোহিঙ্গারা।

মিয়ানমারে ফিরে যেতে কী সমস্যা- চীনের প্রতিনিধি দলের প্রধানের এই প্রশ্নের জবাবে রোহিঙ্গারা বলেন, মিয়ানমারে এখনও রোহিঙ্গাদের জন্য শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। সেদেশে বিবদমান গ্রুপের মধ্যে সংঘাত লেগে আছে। এখনও যেসব রোহিঙ্গা সেদেশে রয়েছে তাদের ওপর নির্যাতন চলছে। এছাড়া ২০১২ সালে আকিয়াবে এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে কয়েক মাসের জন্য একটি জায়গায় জড়ো করে রাখলেও এখন পর্যন্ত একই অবস্থায় রয়েছে তারা। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে গিয়ে বিপদে পড়তে চান না।

কী করলে মিয়ানমারে যাবেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে এ শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা গুরা মিয়া ও মোহাম্মদ জসিম বলেন, আমাদের তিনটি দাবি পূরণ করলে কালই স্বেচ্ছায় নিজ দেশে চলে যাব। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও কেড়ে নেয়া জমি ফেরত দিতে হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

চীনা রাষ্ট্রদূত জানতে চান, বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় মিয়ানমারের পরিস্থিতি দেখতে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দল সে দেশে পাঠালে যাবেন কিনা। এই প্রশ্নের জবাবে রোহিঙ্গারা যাবেন বলে সম্মতি দেন।

চীনের রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গাদের জন্য দুটি প্রস্তাব দেন। একটি হলো- রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের সবাইকে জনপ্রতি দুটি করে মোবাইল সেট দেয়া হবে। একটি নিজে সে দেশে যাওয়ার সময় নিয়ে যাবেন, অন্যটি এখানে পরিবারের কাছে রাখবেন। যদি মিয়ানমারে পরিস্থিতি ভালো হয়, মোবাইলে পরিবারকে সেদেশে ডেকে নিয়ে যাবেন। আরেকটি হলো- প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে গিয়ে অবস্থা দেখে ঘুরে চলে আসবেন। যদি সেখানের অবস্থা ভালো দেখে আসেন তাহলে পরিবার নিয়ে মিয়ানমারে ফেরত যাবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে থাকা এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, চীন ও মিয়ানমার সরকার এক। কার ওপর বিশ্বাস রাখি নিজেরাও সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কয়েক যুগ ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে আসছে মিয়ানমার সরকার। আমরা এখন তাদের আর বিশ্বাস করতে পারি না। তাই আমরা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কথা বলেছি।

এদিকে মতবিনিময় শেষে শালবন শিবিরে অশ্রিত রোহিঙ্গাদের তিনটি বাসায় যান চীনের প্রতিনিধিরা। তারা রোহিঙ্গাদের ঘর ঘুরে দেখেন, পরিবারের লোকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং কিছু স্কুলব্যাগ ও ফুটবল তুলে দেন।

এর আগে সকাল ১০টার দিকে চীনের রাষ্ট্রদূত টেকনাফের কেরুনতলী ট্রানজিট ঘাট পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে প্রত্যাবাসন বিষয়ে লি জিমিং জানতে চাইলে জবাবে ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত) শামসুদ্দৌজা নয়ন বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এ সময় প্রত্যাবাসন জেটি ঘাটে দাঁড়িয়ে নিজের ফোনে ওই এলাকার ছবি তোলেন চীনের রাষ্ট্রদূত।

এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত), নয়াপাড়া শরণার্থী রোহিঙ্গা শিবিরের ইনচার্জ (সিআইসি) আব্দুল হান্নান, জাদিমুরা ও শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরের ইনচার্জ মোহাম্মদ খালিদ হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।

এর আগে রোববার চীনের এই প্রতিনিধি দল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে তমব্রু শূন্য রেখায় আটকা পড়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সীমান্ত এলাকা ঘুরে দেখেন। এখানেও রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা দিলে ফিরে যাবার বাসনা জানান।

গত ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রতিনিধি দল পাঠায় চীন। এ প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার। কিন্তু রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় সেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়।

২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট রাখাইনের ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন শুরু করে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাসহ উখিয়া-টেকনাফের ৩২টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭ জন। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
আমাদের চ্যানেল ৩৬৫ ফেসবুক লাইক পেজ